Md. Afrooz Zaman Khan

Mob:- 01920926131

01920-926131

When you need call me....
Powered by Blogger.
RSS

ফুটবল আমার ধ্যানজ্ঞান : লিওনেল মেসি


লিওনেল মেসি


বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার আজেন্টিনার লিওনেল মেসি। জন্ম আর্জেন্টিনায়, ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন। বিশ্বসেরার স্বীকৃতিস্বরূপ মেসি চারবার ফিফা ব্যালেন ডি’অর সম্মাননা লাভ করেন।
তখন আমি বেশ ছোট। জন্মদিনের এক উপহার পেয়ে আমি চমকে যাই। সেটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার। আমার এক আত্মীয় আমার হাতে ভিন্ন এক জীবন উপহার দেয়—এক নতুন ফুটবল। তিন কিংবা চার বছর বয়সে পাওয়া সেই উপহারের জন্য আজ আমি এখানে। সেই উপহার আমার মনে এতটাই দাগ কেটেছিল যে বড়দিন কিংবা জন্মদিন সব সময়ই উপহার হিসেবে আমার চাওয়া ছিল ফুটবল। 
খুব সাধারণ এক ফুটবলপাগল পরিবারে ছিল আমার বেড়ে ওঠা। আমার বাবা-চাচাদেরও ছিল ফুটবল নিয়ে ভীষণ মাতামাতি। বাবা তো এক ফুটবল ক্লাবের কোচের দায়িত্ব পালন করতেন। প্রতিদিন নিয়ম করে স্কুলে যেতাম। সেখান থেকে ফিরেই মুখে কিছু একটা পুরে রাস্তায় ফুটবল খেলতে ছুটতাম। আমি সৌভাগ্যবান আমার সাধারণ পরিবারের জন্য। বাবার দিনভর পরিশ্রমই ছিল আমাদের একমাত্র রুজি। তিন ভাইয়ের জন্য ছিল বাবা-মায়ের সব আদর। 
ছোটবেলায় আমি বেশির ভাগ সময়ই রাস্তায় ফুটবল খেলতাম। বাড়ির বাইরে যেখানেই সুযোগ পেতাম, সেখানেই খেলতাম। সত্যি বলতে কি, পাঁচ বছর বয়স থেকে ফুটবল আমার বন্ধু। পাড়ার বড় ভাইয়েরা রাস্তার ফুটবল ম্যাচে আমাকে নিতে চাইত না। আমার কাছ থেকে যখন বল নিতে পারত না, তখন তারা আমাকে দুষ্টুমি করে মারধর করতে চাইত। রাস্তার ওপর আমার ফুটবল খেলা নিয়ে আমার ভাই ভীষণ দুশ্চিন্তা করতেন। 
রোজিওতে আমার জন্ম। সেই এলাকার ছোট ফুটবল ক্লাব গ্র্যান্ডোলিতে আমাদের পুরো পরিবারের সবাই বয়স অনুসারে সেই ক্লাবে খেলতাম। মা–ই থাকত শুধু খেলার বাইরে। আমরা প্রতি রোববার সারা দিন ক্লাবের মাঠে দৌড়াদৌড়ি করতাম। মা-দাদিও ছিলেন সেই ক্লাবের পাড় সমর্থক। বাবা তখন ক্লাবে কোচিং করাতেন, তিনিই আমার প্রথম কোচ। প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা মাঠে ফুটবল প্র্যাকটিস করতাম।
সেই রাস্তা, সেই স্মৃতি, সেই সময়—সব আমার বদলে যায় খুব ছোট থাকতেই। স্পেনের বার্সেলোনায় আসার পরেই আমার সব পাল্টে যায়। ফুটবল খেলার বন্ধু, স্কুলের শিক্ষক-সহপাঠী, পরিবার এবং নিজের দেশ ছেড়ে মাত্র ১৩ বছর বয়সে এক মহাসাগর দূরে চলে আসি। এটা ছিল আমার জন্য ভিন্নমাত্রার অভিজ্ঞতা। একদিকে বার্সেলোনা থাকার নতুন অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে ছিল বাড়ি থেকে দূরে থাকার কষ্ট। প্রথম প্রথম অনেক মন খারাপ হতো। একা একা লাগত। কান্নাকাটি করতাম অনেক সময়। নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দিতাম। ধীরে ধীরে আমি নতুন পরিবেশ, নতুন বন্ধুদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করি। আমার স্বপ্ন ছিল বার্সেলোনার মূল দলে ফুটবল খেলা। আমার জীবনের সবকিছু শিখেছি আমি বার্সেলোনাতে এসে। এখানেই আমি বড় হই, লেখাপড়াও এখানকার স্কুলে। 
কিশোর বয়স থেকেই ফুটবল আমার ধ্যান-জ্ঞান। আমি ছোটবেলায় যেভাবে খেলতাম, এখনো সেভাবে খেলি। আমার খেলার ঢং একই রকম। আমি নিজের মতো খেলে যাই। বার্সেলোনাতে খেলে আমি ফুটবল নিয়ে অনেক কৌশল শিখতে পেরেছি।
কিশোর বয়সে প্রথমদিকে খেলার সময় ফুটবল কোচ ফ্যাবিও কাপেলো আমাকে ‘ছোট শয়তান’ তকমা দিয়েছিলেন। আমার জন্য সেটা ছিল খুবই আনন্দের। তিনি ফুটবল কোচ, তাঁর কাছ থেকে এত ছোট বয়সে প্রশংসা পাওয়া নিশ্চয়ই দারুণ ব্যাপার। 
আমি ব্যক্তিগত সম্মাননা কিংবা নিজে বেশি গোল করতে আগ্রহী নই। আমি আমার দলের জন্য সর্বোচ্চ পুরস্কারটাই আনতে চাই। আমি পৃথিবীর সেরা ফুটবলার হওয়ার চেয়ে একজন ভালো মানুষ হতেই বেশি আগ্রহী। কারণ, সবশেষে আমি যখন অবসরে যাব, তখন প্রত্যাশা থাকবে সবাই যেন আমাকে বিনয়ী হিসেবেই চেনে। আমি গোল করতে পছন্দ করি কিন্তু বন্ধুত্ব করতেও আগ্রহী বেশি। দলের ফুটবলাররা আমার বন্ধু। তাঁদের ছাড়া আমি তো আসলে শূন্য।
আমি হারতে ভীষণ অপছন্দ করি। সেটা বাস্তব জীবনেও। দরিদ্রতা আমাকে রাগায়। আমি এমন একটি দেশ থেকে এসেছি, যেখানে দারিদ্র্যই বাস্তবতা। সেখানে অনেক শিশু আছে, যাদের বাধ্য হয়ে ভিক্ষা করতে হয়। অন্য কিছু করার উপায় নাই বলে অনেক কম বয়সে কাজে করতে হয়। আমি বার্সেলোনাতে একটু ভালো পরিবেশে থাকার সুযোগ পেয়েছি। বাবার সঙ্গে থাকার সুযোগ পাই। কিন্তু বাস্তবতা আসলেই ভিন্ন। অনেক বাবা হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে তাঁদের সন্তানকে বড় করতে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।
তথ্যসূত্র: এল পাই্যজ (২০১২) এবং ওয়ার্ল্ড সকার ম্যাগাজিনে (২০১৩) দেওয়া মেসির সাক্ষাৎকার।

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

বেড়ে ওঠার দিনগুলো



হ‌ুমায়ূন আহমেদ জন্ম: ১৩ নভেম্বর ১৯৪৮—মৃত্যু: ১৯ জুলাই ২০১২





















শুনলাম, আমি রাস্তায় ঘুরে ঘুরে পুরোপুরি বাঁদর হয়ে গেছি। আমার বাঁদরজীবনের সমাপ্তি ঘটানোর জন্যই আমাকে নাকি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হবে। আমার প্রথম স্কুলে যাওয়া উপলক্ষে একটা নতুন খাকি প্যান্ট কিনে দেওয়া হলো। সেই প্যান্টের কোনো জিপার নেই। সারাক্ষণ হা হয়ে থাকে। অবশ্যি তা নিয়ে আমি খুব একটা উদ্বিগ্ন হলাম না। নতুন প্যান্ট পরছি—এই আনন্দেই আমি আত্মহারা।
মেজো চাচা আমাকে কিশোরীমোহন পাঠশালায় ভর্তি করিয়ে দিয়ে এলেন এবং হেড মাস্টার সাহেবকে বললেন, চোখে চোখে রাখতে হবে। বড়ই দুষ্ট।
আমি অতি সুবোধ বালকের মতো ক্লাসে গিয়ে বসলাম। মেঝেতে পাটি পাতা। সেই পাটির ওপর বসে পড়াশোনা। ছেলেমেয়ে সবাই পড়ে। মেয়েরা বসে প্রথম দিকে, তাদের পেছনে ছেলেরা। আমি খানিকক্ষণ বিচার-বিবেচনা করে সবচেয়ে রূপবতী বালিকার পাশে ঠেলেঠুলে জায়গা করে বসে পড়লাম। রূপবতী বালিকা অত্যন্ত হৃদয়হীন ভঙ্গিতে তুই তুই করে সিলেটি ভাষায় বলল, এই তোর প্যান্টের...।
ক্লাসের সব কটা ছেলেমেয়ে একসঙ্গে হেসে উঠল। মেয়েদের আক্রমণ করা অনুচিত বিবেচনা করে সবচেয়ে উচ্চ স্বরে যে ছেলেটি হেসেছে, তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। হাতের কনুইয়ের প্রবল আঘাতে রক্তারক্তি ঘটে গেল। দেখা গেল ছেলেটির সামনের একটি দাঁত ভেঙে গেছে। হেড মাস্টার সাহেব আমাকে কান ধরে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ দিলেন। ছাত্রছাত্রীদের উপদেশ দিলেন—এ মহা গুন্ডা। তোমরা সাবধানে থাকবে। খুব সাবধান। পুলিশের ছেলে গুন্ডা হওয়াই স্বাভাবিক।
ক্লাস ওয়ান ১২টার মধ্যে ছুটি হয়ে যায়। এই দুই ঘণ্টা আমি কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমার সময়টা যে খুব খারাপ কাটল, তা নয়। স্কুলের পাশেই আনসার ট্রেনিং ক্যাম্প। তাদের ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। লেফট রাইট, লেফট রাইট। দেখতে বড়ই ভালো লাগছে। মনে মনে ঠিক করে ফেলাম, বড় হয়ে আনসার হব।
ক্লাসের দ্বিতীয় দিনেও শাস্তি পেতে হলো। মাস্টার সাহেব অকারণেই আমাকে শাস্তি দিলেন। সম্ভবত প্রথম দিনের কারণে আমার ওপর রেগে ছিলেন। তিনি মেঘস্বরে বললেন, গাধাটা মেয়েদের সঙ্গে বসে আছে কেন? অ্যাই, তুই কান ধরে দাঁড়া। দ্বিতীয় দিনেও সারাক্ষণ কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম।
অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার, তৃতীয় দিনেও একই শাস্তি। তবে এই শাস্তি আমার প্রাপ্য ছিল। আমি একটা ছেলের স্লেট ভেঙে ফেললাম। ভাঙা স্লেটের টুকরায় তার হাত কেটে গেল। আবার রক্তপাত, আবার কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকার শাস্তি।
আমি ভাগ্যকে স্বীকার করে নিলাম। ধরেই নিলাম যে স্কুলের দু ঘণ্টা আমাকে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। 
আজকের পাঠক-পাঠিকাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি সত্যি আমাকে পাঠশালার প্রথম শ্রেণিটি কান ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কাটাতে হয়েছে। তবে আমি একা ছিলাম না, বেশির ভাগ সময় আমার সঙ্গী ছিল শংকর। সে খানিকটা নির্বোধ প্রকৃতির ছিল। ক্লাসে শংকর ছাড়া আমার আর কোনো বন্ধু জুটল না। সে আমার সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে রইল। আমি যেখানে যাই, সে আমার সঙ্গে আছে। মারামারিতে সে আমার মতো দক্ষ নয়, তবে মারামারির সময় দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে আঁ-আঁ ধরনের গরিলার মতো শব্দ করে প্রতিপক্ষের দিকে ছুটে যেত। এতেই অনেকের পিলে চমকে যেত। শংকরকে নিয়ে শিশুমহলে আমি বেশ ত্রাসের সঞ্চার করে ফেলি।
এই সময় স্কুলে কিছুদিনের জন্য কয়েকজন ট্রেনিং স্যার এলেন। ট্রেনিং স্যার ব্যাপারটা কী আমরা কিছুই জানি না। হেড স্যার শুধু বলে গেলেন, নতুন স্যাররা আমাদের কিছুদিন পড়াবেন। দেখা গেল, নতুন স্যাররা বড়ই ভালো। পড়া না পারলেও শাস্তি দেওয়ার বদলে মিষ্টি করে হাসেন। হইচই করলেও ধমকের বদলে করুণ গলায় চুপ করতে বলেন। আমরা মজা পেয়ে আরও হইচই করি। একজন ট্রেনিং স্যার, কেন জানি না, সব ছাত্রছাত্রীকে বাদ দিয়ে আমাকে নিয়ে পড়লেন। অদ্ভুত সব প্রশ্ন করেন। আমার যা মনে আসে বলি আর উনি গম্ভীর মুখে বলেন, তোর এত বুদ্ধি হলো কী করে? বড়ই আশ্চর্যের ব্যাপার। তোর ঠিকমতো যত্ন হওয়া দরকার। তোকে নিয়ে কী করা যায় তাই ভাবছি। কিছু একটা করা দরকার।
কিছু করার আগেই স্যারের ট্রেনিংকাল শেষ হয়ে গেল। তিনি চলে গেলেন। তবে কেন জানি কিছুদিন পরপরই আমাকে দেখতে আসেন। গভীর আগ্রহে পড়াশোনা কেমন হচ্ছে তার খোঁজ নেন। সব বিষয়ে সবচেয়ে কম নম্বর পেয়ে ক্লাস টুতে ওঠার সংবাদ পাওয়ার পর স্যারের উৎসাহে ভাটা পড়ে যায়। শুধু যে উৎসাহে ভাটা পড়ে তা-ই না, উনি এতই মন খারাপ করেন যে আমার নিজেরও খারাপ লাগতে থাকে।
ক্লাস টুতে উঠে আমি আরেকটি অপকর্ম করি। যে রূপবতী বালিকা আমার হৃদয় হরণ করেছিল, তাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে ফেলি। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করি, বড় হয়ে সে আমাকে বিয়ে করতে রাজি আছে কি না। প্রকৃতির কোনো এক অদ্ভুত নিয়মে রূপবতীরা শুধু যে হৃদয়হীন হয় তা-ই না, খানিকটা হিংস্র স্বভাবেরও হয়। সে আমার প্রস্তাবে খুশি হওয়ার বদলে বাঘিনীর মতো আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। খামচি দিয়ে হাতের দু-তিন জায়গার চামড়া তুলে ফেলে। স্যারের কাছে নালিশ করে। শাস্তি হিসেবে দুই হাতে দুটি ইট নিয়ে আমাকে নিল ডাউন হয়ে বসে থাকতে হয়। প্রেমিক পুরুষদের প্রেমের কারণে কঠিন শাস্তি ভোগ করা নতুন কোনো ব্যাপার নয়, তবে আমার মতো এত কম বয়সে প্রেমের এমন শাস্তির নজির বোধ হয় খুব বেশি নেই।
স্কুল আমার ভালো লাগত না। মাস্টাররা অকারণে কঠিন শাস্তি দিতেন। পাঠশালা ছুটির পর বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী চোখ মুছতে মুছতে বাড়ি যাচ্ছে, এ ছিল প্রাত্যহিক ঘটনা। আমাদের পাঠশালায় প্রথম শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার ব্যবস্থা। কিন্তু একটা ক্লাস থেকে অন্য ক্লাস আলাদা করা নয়, অর্থাৎ কোথাও কোনো পার্টিশনের ব্যবস্থা নেই। কোনো ক্লাসে একজন শাস্তি পেলে পাঠশালার সবাই তা দেখে বিমলানন্দ ভোগ করত।
আমার জীবনে শিক্ষকেরা এসেছেন দুষ্টগ্রহের মতো। আমি সারা জীবনে অনেক কিছু হতে চেয়েছি—আইসক্রিমওয়ালা, জুতা পলিশওয়ালা থেকে ডাক্তার, ব্যারিস্টার কিন্তু কখনো শিক্ষক হতে চাইনি। চাইনি বলেই বোধ হয় এখন জীবন কাটাচ্ছি শিক্ষকতায়।
থ্রি থেকে ফোরে উঠব। বার্ষিক পরীক্ষা এসে গেছে। বাড়িতে বাড়িতে পড়াশোনার ধুম। আমি নির্বিকার। বই নিয়ে বসতে ভালো লাগে না। যদিও পড়তে বসতে হয়। সেই বসাটা পুরোপুরিই ভান। সবাই দেখল, আমি বই নিয়ে বসে আছি, এই পর্যন্তই। তখন প্রতি সন্ধ্যায় সিলেট শহরে মজাদার ব্যাপার হতো—তার নাম ‘লেমটন লেকচার’। কথাটা বোধ হয় ‘লন্ঠন লেকচার’-এর বিকৃত রূপ। ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে করে জায়গায় জায়গায় সিনেমা দেখায়: পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ম্যালেরিয়া এইসব ভালো ভালো জিনিস। আমাদের কাজের ছেলে রফিক খোঁজ নিয়ে আসে আজ কোথায় লেমটন লেকচার হচ্ছে—মুহূর্তে আমরা দুজন হাওয়া। রফিক তখন আমার বন্ধুস্থানীয়। লেমটন লেকচারের ভূত আমার ঘাড় থেকে নামানোর অনেক চেষ্টা করা হলো। নামান গেল না। মা হাল ছেড়ে দিলেন। এখন আর সন্ধ্যা হলে পড়তে বসতেও বলেন না। আমি মোটামুটি সুখে আছি বলা চলে।
এমন এক সুখের সময়ে মাথামোটা শংকর খুব উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলল, তার মা তাকে বলেছেন সে যদি ক্লাস থ্রি থেকে পাস করে ফোর-এ উঠতে পারে, তাহলে তাকে ফুটবল কিনে দেবেন।
সে আমার কাছে এসেছে সাহায্যের জন্য। কী করে এক ধাক্কায় পরের ক্লাসে ওঠা যায়। একটা চামড়ার ফুটবলের আমাদের খুবই শখ। সেই ফুটবল এখন মনে হচ্ছে খুব দূরের ব্যাপার নয়। সেই দিনই পরম উৎসাহে শংকরকে পড়াতে বসলাম। যে করেই হোক তাকে পাস করাতে হবে। দুজন একই ক্লাসে পড়ি। এখন সে ছাত্র, আমি শিক্ষক। ওকে পড়ানোর জন্য নিজেকে প্রথম পড়তে হয়, বুঝতে হয়। যা পড়াই কিছুই শংকরের মাথায় ঢোকে না। মনে হয় তার দুই কানে রিফ্লেকটর লাগান। যা বলা হয় সেই রিফ্লেক্টরে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে, ভেতরে ঢুকতে পারে না। যাই হোক, প্রাণপণ পরিশ্রমে ছাত্র তৈরি হলো। দুজন পরীক্ষা দিলাম। ফল বের হলে দেখা গেল, আমার ছাত্র ফেল করেছে এবং আমি স্কুলের সমস্ত শিক্ষককে স্তম্ভিত করে প্রথম হয়ে গেছি। ফুটবল পাওয়া যাবে না এই দুঃখে রিপোর্ট কার্ড হাতে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরলাম।
এই ক্ষুদ্র ঘটনা বাবাকে খুব মুগ্ধ করল। বাসায় যে-ই আসে বলেন, আমার এই ছেলের কাণ্ড শুনুন। পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরেছে। কারণ হলো...।
এই ঘটনার আরেকটি সুফল হলো, বাবা মাকে ডেকে বলে দিলেন—কাজলকে পড়াশোনা নিয়ে কখনো কিছু বলার দরকার নেই। ও ইচ্ছা হলে পড়বে, ইচ্ছা না হলে না। তাকে নিজের মতো থাকতে দাও। আমি পরিপূর্ণ স্বাধীনতা পেয়ে গেলাম। এই আনন্দের চেয়েও বড় আনন্দ, বিশেষ বিবেচনায় মাথামোটা শংকরকে প্রমোশন দিয়ে দেওয়া হলো। তার মা সেই খুশিতে তাকে একটা এক নম্বরি ফুটবল এবং পাম্পার কিনে দিলেন।
গ্রিন বয়েজ ফুটবল ক্লাবের প্রতিষ্ঠা হলো। আমি ক্লাবের প্রধান এবং শংকর আমার অ্যাসিসটেন্ট। আমাদের বাসার কাজের ছেলে রফিক আমাদের ফুলব্যাক। অসাধারণ খেলোয়াড়। (নির্বাচিত অংশ)
সূত্র: আমার ছেলেবেলা, হুমায়ূন আহমেদ। আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়ায়, কাকলী প্রকাশনী, ২০০২

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

একবার না পারিলে দেখো ‘আট বার’


হ্যারি পটার চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী  এমা ওয়াটসনআইনজীবী বাবা-মায়ের সন্তান। একমাত্র মেয়ে হওয়ায় প্রত্যাশার চাপটাও ছিল অনেক। আইনজীবীর সন্তান আইনজীবী হবে, এমনটাই ছিল সবার প্রত্যাশা। কিন্তু কারও কথার তোয়াক্কা না করে নিজের পথেই হেঁটেছেন এমা ওয়াটসন। পারিবারিক পরিমণ্ডল ব্রিটিশ, কিন্তু জন্ম প্যারিসে বলেই কি না শিল্প-সাহিত্যে এত ঝোঁক। সাফল্যের শীর্ষে যাওয়ার সিঁড়িতে একটু একটু করে এগিয়ে গেছেন।
শিশুতোষ চলচ্চিত্র হ্যারি পটারের বিখ্যাত চরিত্র হারমিওনি গ্রেঞ্জার নামে চেনে সবাই তাঁকে। মাত্র নয় বছর বয়সে শান্তশিষ্ট সেই মেয়ে প্রথম ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। এমার নিজেকে নিয়ে কথা হলো, ‘আমার মন যা চায়, ইচ্ছেমতো আমি তাই করি। আমি সবাইকে খুশি করতে পারব না।’
নিজের কাজকে যতখানি গুরুত্ব দেন এমা, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন পড়াশোনাকে। একদিকে হ্যারি পটারের হারমিওনি, অন্যদিকে স্কুলের পড়াশোনা করে গেছেন সমানতালে। তার ফলও পেয়েছেন হাতেনাতে। ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত হ্যারি পটারের সব কটি সিনেমায় দেখিয়েছেন অভিনয়ের ঝলক। আটবারের অডিশনের পরে পর্দায় হ্যারি পটারের বন্ধু হওয়ার সুযোগ মেলে তাঁর। আর ২০১০ সালে ভর্তি হন ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০১৪ সালে এসে অবশেষে স্নাতক ডিগ্রির তকমা মাথায় নিলেন এমা। ইংরেজি সাহিত্যেই ব্যাচেলর ডিগ্রি নেন এই তারকা।
শুধু পড়াশোনাই নয়, যোগব্যায়াম আর মেডিটেশন শেখানোর সনদও আছে তাঁর। তরুণ এই অভিনেত্রী দৃষ্টিনন্দন অভিনয়ের জন্য ন্যাশনাল মুভি অ্যাওয়ার্ডস, টিন চয়েস অ্যাওয়ার্ডস ও এমটিভি মুভি অ্যাওয়ার্ডস লাভ করেছেন।

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

সফল ড্রপ আউট!



বিল গেটসবিল গেটস
তিনি মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। তাঁকে বলা হয় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সফল ড্রপ আউট। ১৯৭৩ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন বিল। স্যাট পরীক্ষায় ১৬০০ নম্বরে ১৫৯০ পান তিনি। কিন্তু কম্পিউটার সফটওয়্যার তৈরির নেশায় তিনি ১৯৭৫ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাম কাটান। ড্রপ আউট হওয়ার ৩২ বছর পরে ২০০৭ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় বিল গেটসকে অনারারি ডিগ্রি প্রদান করে। একই সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সমাবর্তন বক্তা ছিলেন বিল গেটস।



স্টিভ জবস
অ্যাপল–এর সহপ্রতিষ্ঠাতা প্রযুক্তিবিস্ময় স্টিভ জবস ছিলেন কলেজ ড্রপ আউট। হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষে ১৯৭২ সালে রিড কলেজে ভর্তি হন স্টিভ। কিন্তু কলেজটি ব্যয়বহুল হওয়ার কারণে পড়ালেখা চালিয়ে নিতে পারেননি। ছয় মাসের মধ্যে নাম কাটা যায় তাঁর। নামা কাটার পরেও ১৮ মাস সেই কলেজের ডর্মের বন্ধুর রুমে থাকতেন। ডিগ্রি নেই তো কী হয়েছে, স্টিভ জবস ২০০৫ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন বক্তা ছিলেন। স্টিভ জবসের জীবনাবসান হয় ৫ অক্টোবর ২০১১ সালে।



মার্ক জাকারবার্গমার্ক জাকারবার্গ
মার্ক জাকারবার্গ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে বসে বন্ধুদের নিয়ে তৈরি করেন ফেসবুক। ২০০৪ সালে ফেসবুক প্রতিষ্ঠার পরেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড্রপ আউট হন তিনি। ফেসবুক এখন বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। জাকারবার্গ ২০১১ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়াতে সমাবর্তন বক্তব্য দেন।

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

শুরুতে হ্যারি পটার বইটি কেউ ছাপতেই চায়নি



ষাটের দশকের শেষের দিকের কথা। ইংল্যান্ডের এক গ্রামে থাকে বাবা, মা আর তাঁদের ছোট্ট দুটি মেয়ে। বড় বোনের কাছে ছোট বোনের আবদারের শেষ নেই, গল্প না শোনালে সে ঘুমাতেই চায় না। কিন্তু রোজ রোজ নতুন গল্প কোথায় পাওয়া যায়! উপায় না দেখে বড় বোন মনের মাধুরী মিশিয়ে মুখে মুখে গল্প বানাতে শুরু করে। সেই বড় বোনটি আজ পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় গল্পকার—হ্যারি পটারের লেখক জে কে রাউলিং।
ছোটবেলায় আর ১০ জন ছেলেমেয়ের মতো খেলাধুলার প্রতি তেমন ঝোঁক ছিল না রাউলিংয়ের। ভারি লাজুকধরনের মেয়ে ছিলেন তিনি, চুপচাপ বসে বসে পড়তেই বেশি ভালোবাসতেন। ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তিনি চলে যান লন্ডনে। সেখানে গিয়ে সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারেন, সেক্রেটারি হওয়া তাঁর কাজ নয়, তিনি নাকি প্রচণ্ড অগোছাল আর অমনোযোগী! হবেই বা না কেন, মিটিংয়ের সময় যখন চটপট নোট নেওয়ার কথা, তখন যে তাঁর মাথায় নতুন গল্পের আইডিয়া খেলে বেড়ায়। সেক্রেটারি হওয়ার আশা ছেড়ে তিনি ঠিক করেন ইংরেজির শিক্ষক হবেন। ইংল্যান্ড ছেড়ে পর্তুগালে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় এক পর্তুগিজ সাংবাদিকের। কিছুদিনের মধ্যেই বিয়ে করেন তাঁরা, সন্তানও হয় তাঁদের। কিন্তু মেয়ের জন্মের চার মাসের মাথাতেই রাউলিং ও তাঁর স্বামীর বিচ্ছেদ হয়। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রাউলিং দেশে ফিরে আসেন।
শুরু হয় রাউলিংয়ের জীবনের সবচেয়ে কষ্টের অধ্যায়। সংসার ভেঙে গেছে, কোলে ছোট্ট মেয়ে, একটি চাকরি পর্যন্ত নেই। সরকারি ভাতার ওপর নির্ভর করে কোনো রকমে মা-মেয়ের বেঁচে থাকা। তীব্র অনিশ্চয়তায় কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরবর্তী সময়ে সেই ভয়াবহ হতাশার দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমি আত্মহত্যা করার কথাও ভেবেছিলাম। শুধু মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে পেরে উঠিনি। মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আমি নিজেকে সামলে নিই। বেশ বুঝতে পারছিলাম, আমার নিজের এই অবস্থা হলে মেয়েকে মানুষ করতে পারব না। অতঃপর নিজেকে শেষ করে দেওয়ার বদলে আমি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই, নয় মাস ধরে একজন কাউন্সিলরের কাছে চিকিৎসা নিতে হয় আমাকে।’
স্কটল্যান্ডের এডিনবরার এক ক্যাফেতে বসে তিনি একটু একটু করে লেখালেখি শুরু করেন। বহুদিন আগে ম্যানচেস্টার থেকে ট্রেনে লন্ডনে যাওয়ার সময় তাঁর মাথায় একটি গল্পের চিন্তা এসেছিল—এক ছোট্ট ছেলের কাহিনি, যে ট্রেনে চড়ে জাদুকরদের এক স্কুলে ভর্তি হতে যাচ্ছে। সেই ছেলে আর কেউ নয়, হ্যারি পটার। ১৯৯৫ সালে রাউলিং হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোসফার’স স্টোন বইটি লেখা শেষ করেন আর কয়েকজন এজেন্টকে বইয়ের পাণ্ডুলিপি পাঠান। মজার বিষয় হলো, শুরুতে কোনো প্রকাশক বইটি ছাপতেই রাজি হয়নি। বড় বড় অনেক প্রকাশক পাণ্ডুলিপিটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। টানা এক বছর ধরে চেষ্টার পর একজন প্রকাশক পাওয়া যায়। তা-ও সম্ভব হয়েছিল সেই প্রকাশকের আট বছর বয়সী মেয়ের কারণে, যে বইটি দারুণ পছন্দ করেছিল। বইটি প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অগ্রিম সম্মানী হিসেবে রাউলিংকে দেড় হাজার পাউন্ড দেওয়া হয়। প্রথম প্রকাশে ছাপা হয়েছিল মাত্র এক হাজার কপি, যার মধ্যে ৫০০ কপিই বিক্রি করা হয়েছিল বিভিন্ন স্কুলের লাইব্রেরির কাছে। হ্যারি পটারের প্রথম সংস্করণের সেই বইগুলো আজ পৃথিবীজুড়ে সংগ্রাহকদের কাছে এক অমূল্য, দুষ্প্রাপ্য সম্পদ বলে বিবেচিত হয়, আর প্রতিটি বইয়ের বর্তমান দাম বেশি নয়, মাত্র ২৫ হাজার পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৩ লাখ টাকা)।
১৯৯৮ সালে ওয়ার্নার ব্রাদার্সকে রাউলিং তাঁর প্রথম দুটি বইয়ের চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বত্ব বিক্রি করে দেন, এরপর আর কখনো অর্থাভাবে পড়তে হয়নি তাঁকে। হ্যারি পটার সিরিজের বইগুলো একের পর এক সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করে। প্রকাশনা জগতের ইতিহাসে সব রেকর্ড ভেঙে হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য গবলেট অব ফায়ার বইটি প্রকাশ হওয়ার প্রথম দিনেই যুক্তরাজ্যে বিক্রি হয় প্রায় তিন লাখ কপি, আর দুদিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হয় ৩০ লাখ কপিরও বেশি!
সাফল্যের শিখরে উঠলেও নিজের সবচেয়ে কষ্টের দিনগুলোর স্মৃতি ভুলে যাননি রাউলিং। ২০০০ সালে তিনি একটি দাতব্য ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন, যা দুস্থ নারী ও শিশুদের জন্য প্রতিবছর প্রায় ৫০ লাখ পাউন্ডের মতো সহায়তা প্রদান করে থাকে।

তথ্যসূত্র: ২০০৮ সালের ২৩ মার্চ যুক্তরাজ্যভিত্তিক পত্রিকা ডেইলি মেইলকে দেওয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে 

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

আমরা পথে বসে গেলাম





ফুটবল বিশ্বকাপে শাকিরা না থাকলে কি চলে? তাই তো এবারের বিশ্বকাপের সমাপনী অনুষ্ঠানেও শাকিরা ‘লা লা’ গান দিয়ে মাতালেন পুরো বিশ্বকে। তাঁর গাওয়া ২০১০ বিশ্বকাপের অফিশিয়াল থিম সং ‘ওয়াকা ওয়াকা’ ছিল ইউটিউবে সর্বাধিক শোনা গানের অন্যতম। শাকিরার জন্ম ১৯৭৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, কলম্বিয়ায়। তাঁর ক্যারিয়ারে তিনি পেয়েছেন গ্র্যামি, গোল্ডেন গ্লোব, আমেরিকান মিউজিক অ্যাওয়ার্ড, এমটিভি মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসহ অনেক পুরস্কার।
তখন শাকিরার বয়স সবে আট বছর। হঠাৎই একদিন তাঁর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। ব্যবসায় ধস নামলে শাকিরার বাবা অর্থাভাবে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করেন আর মেয়েকে জোর করে আত্মীয়দের সঙ্গে থাকতে পাঠিয়ে দেন। কিছুদিন পর শাকিরা নিজ শহরে ফিরে এসে দেখেন তাঁদের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সেই স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি বলেন, ‘বাড়ি ফিরে দেখি আমাদের সব আসবাব বিক্রি করে ফেলা হয়েছে, রঙিন টিভিটা নেই। দুটো গাড়ির একটাও নেই। আমি ভীষণ ভেঙে পড়ি।’ শাকিরার গান-নাচ সব থেমে যাওয়ার উপক্রম। কিন্তু বড় হয়ে যিনি বিশ্ব মাতাবেন, তাঁর তো থেমে যাওয়া সাজে না। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের আত্মবিশ্বাস অটুট রেখে সংগীতচর্চা অব্যাহত রাখেন। শাকিরার গানের সঙ্গে সখ্য অবশ্য একেবারে অল্প বয়সেই। মাত্র চার বছরেই! চার বছরের ছোট্ট মেয়েটিই আস্ত একটা কবিতা লিখে ফেলেন, গালভরা একটা নামও দেন—লা রোসা দো ক্রিস্টাল (বাংলায় ‘স্ফটিকের গোলাপ’)। বাবাকে টাইপরাইটারে প্রায়ই গল্প লিখতে দেখে তাঁর নিজের একটা টাইপরাইটারের খুব শখ জাগে। বড়দিনের উপহার হিসেবে তাই জামা-জুতোর বদলে একটি টাইপরাইটার চেয়ে বসেন ছোট্ট শাকিরা। অবশেষে সাত বছর বয়সে হাতে আসে স্বপ্নের উপহার, তখনই কবিতা আর গান লিখে হাত পাকানোর শুরু। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে এক রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে আরবীয় সুর ও ঐতিহ্যবাহী এক বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। সুরটি ছোট্ট শাকিরার এত ভালো লাগে যে উচ্ছ্বসিত হয়ে টেবিলের ওপর উঠে নাচতে থাকেন তিনি।
বাবাকে কালো চশমা পরে থাকতে দেখে আট বছর বয়সে শাকিরা ‘তোমার কালো চশমা’ নামে তাঁর প্রথম গান লিখে ফেলেন। এভাবে শৈশবেই সংগীতের ভুবনে পথচলা শুরু পৃথিবীজুড়ে সংগীতপিপাসু কোটি ভক্তের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া গায়িকা শাকিরার। 
ছোটবেলায় ক্যাথলিক স্কুলের শত নিয়মকানুনের মধ্যেও শাকিরার শিল্পচর্চা থেমে যায়নি। ক্লাসের সহপাঠীদের জন্য তো বটেই, শিক্ষকদের সামনেও তিনি গান গাইতেন। কিন্তু স্কুলের আনুষ্ঠানিক গানের দলে তাঁকে নেওয়া হয়নি কখনো। গানের দলের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক বলেছিলেন যে শাকিরার গান শুনলে মনে হয় ‘ছাগল ভ্যঁা ভ্যঁা করছে’। এমন বিদ্রুপ আর সমালোচনার পরও তিনি দমে যাননি। গান-নাচ দুটোই পুরোদমে নিজের চেষ্টায় চালিয়ে যেতে থাকেন। প্রতি শুক্রবারে স্কুলের সবার সামনে এ সপ্তাহে শেখা নতুন নাচের মুদ্রা পরিবেশন করতেন শাকিরা। তখন থেকেই তাঁর স্বপ্ন শিল্পী হওয়ার। বয়স ১০ হতে না-হতেই এলাকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেতে থাকেন তিনি। 
কিন্তু স্বপ্ন আর প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও বাধ সাধে ভাগ্য। বাবার দেউলিয়া অবস্থায় পুরো পরিবারের সঙ্গে শিশু শাকিরার সময়ও কাটছিল চরম হতাশায়। এ সময় তাঁর বাবা তাঁকে একটি পার্কে বেড়াতে নিয়ে যান, যাতে তিনি বুঝতে পারেন, অনেকের অবস্থা তাঁদের চেয়েও খারাপ। সেদিন পার্কে গিয়ে অনাথ, নিরাশ্রয় শিশুদের দেখতে দেখতে তাঁর হতাশা পরিণত হলো সংকল্পে। ‘পার্কে আমার বয়সী এমনকি আমার চেয়েও ছোট ছেলেমেয়েরা খালি পায়ে ঘুরে বেড়াত। তাদের কারও বাবা-মা ছিল না, থাকার জায়গাও ছিল না। এই বয়সেই তারা নেশায় জড়িয়ে পড়েছিল। এসব দেখে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম নিজের দুর্দশা তো কাটিয়ে উঠবই, কোনো দিন যদি বড় শিল্পী হতে পারি তবে এমন শিশুদের সাহায্যের জন্য সাধ্যমতো কাজ করব।’ প্রতিজ্ঞা করেন শাকিরা।
নিজের সেই প্রতিজ্ঞা সফলভাবেই রাখতে পেরেছেন শাকিরা। আজ সংগীতজগতের সবচেয়ে ধনী ও সফল তারকাদের অন্যতম তিনি। শুধু অর্থের দিক থেকেই নয়, অসাধারণ সংগীতে কোটি কোটি মানুষকে মুগ্ধ করে রেখেছেন তিনি। সমাজসচেতন এই শিল্পী জড়িত রয়েছেন সেবামূলক কাজের সঙ্গেও। নিজের দেশে তিনি শিশুদের জন্য গড়ে তুলেছেন পিএজ দেস্কালজস্ ফাউন্ডেশন। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁকে ‘প্রেসিডেন্টস অ্যাডভাইসরি কমিশন অন এডুকেশনাল এক্সেলেন্স ফর হিস্পানিকস’-এর একজন উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করেন। ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত হিসেবেও কাজ করছেন তিনি।
সূত্র: ২০০৯ সালে দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকাকে দেওয়া শাকিরার সাক্ষাৎকার ও তাঁর ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট অবলম্বনে

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

লিখতে শুরু করে দাও







জীবনের ভালো লাগার মুহূর্তগুলোকে ধরে রাখতে চাইলে, কিংবা মনের সবচেয়ে খাঁটি অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে হলে সেগুলো লিখে রাখার কোনো বিকল্প নেই। আবার সুখের পাশাপাশি সবার জীবনে অনেক কঠিন সময় আসে, যখন বাস্তবতার সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়, অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন হয়। বিগত বছরগুলোতে আমি শিখেছি কীভাবে আমার সুখ-দুঃখের অনুভূতিগুলোকে ভাষায় প্রকাশ করা যায়। লিখতে লিখতে আমি নিজেকে নতুনভাবে চিনতে পেরেছি, নিজের সম্পর্কে এমন অনেক কিছু আবিষ্কার করেছি, যা আগে জানতামই না। সাহস করে মুখে যা সবার সঙ্গে বলতে পারতাম না, লেখার মাধ্যমে আমি তা প্রকাশ করতে পেরেছি। 
সবার জীবনের গল্পই অনন্য, একজনের গল্পের সঙ্গে অন্য কারও গল্পের মিল পাওয়া যায় না। তাই সে গল্পকে কাগজে লিখে ফেলায় যথেষ্ট সার্থকতা রয়েছে। একবার দ্বিধা ঝেড়ে লিখতে শুরু করলে দেখবেন চিন্তার ধরনটাই বদলে যাচ্ছে, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠছে, আপনি এক নতুন রূপে আবির্ভূত হচ্ছেন। লিখতে লিখতেই আমি জেনেছি নিজের কাছে সৎ থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। 
আমরা অনেক কিছু গোপন রাখি, কাউকে জানাতে চাই না। অন্যে কী ভাববে এই ভয়ে আমরা প্রায় মরে যাই। আমরা ধরেই নিই আমাদের ভুলের কথা, ব্যর্থতার ইতিহাস জানলে গোটা পৃথিবী হাসবে। এভাবে আমাদের মধ্যে দ্বৈত সত্ত্বার সৃষ্টি হয়, একটি সত্ত্বা আমরা সত্যি যা তাই, আর অন্য সত্ত্বাটি হলো অন্যদের সামনে আমরা যা সেজে থাকি। কিন্তু এভাবে নিজেদের আসল পরিচয় হারিয়ে ফেলা উচিত নয়।
লেখালেখি একটি শিল্প; নিজেকে জানার জন্য হলেও এই শিল্পের চর্চা করা প্রয়োজন। ভালো-মন্দ সব মিলিয়ে জীবনের টুকরো অভিজ্ঞতাগুলো লেখার মাধ্যমে ধরে রাখতে হবে। দু-একবার লিখে ছেড়ে দিলে হবে না, লেখা চালিয়ে যেতে হবে। অনেকে ব্যক্তিগত ডায়েরি লেখে, আবার কেউ কেউ অন্যদের মাঝে নিজের চিন্তাগুলোকে ছড়িয়ে দিতে তা বই হিসেবে প্রকাশ করে। কেউ গল্প লেখে, কেউ কবিতা। আপনি যেভাবেই লিখুন না কেন, তা সম্পূর্ণ আপনার নিজস্ব ব্যাপার। এখানে কোনো ঠিক-বেঠিক, ভালো-খারাপ নেই। যখন বুকে জমে থাকা কষ্টগুলোকে নিয়ে লিখবেন, তখন আপনার চোখ থেকে অশ্রু ঝরবে ঠিকই, কিন্তু লিখতে লিখতে একসময় আপনি আগের চেয়ে শত হাজার গুণ ভালো বোধ করবেন। জীবনকে এক অন্য আলোয় আবিষ্কার করবেন। 
আমার জীবনের গল্প হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো যদি আমি লিখতে শুরু না করতাম। মুখচোরা, লাজুক আর দ্বিধাগ্রস্ত এক ছেলে থেকে আজ আমি পরিণত হয়েছি এক ভিন্ন ব্যক্তিত্বে। আপনাদের হয়তো বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে, তবু আমি বলব, একবার লিখতে শুরু করেই দেখুন না কী হয়! আপনার জীবনের গল্প আপনি না লিখলে লিখবে কে? আমার প্রথম বইটি বের হওয়ার পর সাত বছর পেরিয়ে গেছে। আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাতে চাই আমি শিগগিরই আমার তৃতীয় বই লিখতে যাচ্ছি, যা হবে আমার আত্মজীবনী। আমি ‘ইন্সপায়ার ওয়ান মিলিয়ন’-এর পথচলার গল্প বলব সেখানে। আগামী বছরের শেষের দিকে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে বইটির মোড়ক উন্মোচন করার ইচ্ছা আছে। তবে তার আগেই আপনাদের সঙ্গে আমার দেখা হচ্ছে আগামী মাসে, বাংলাদেশের ১০টি জেলায় ‘ইন্সপায়ার ওয়ান মিলিয়ন’-এর অনুষ্ঠান করতে আসছি আমি। তত দিন পর্যন্ত ভালো থাকুন। ঈদ মোবারক! 

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS