
আমাদের দেশে ডায়বেটিস হল এখন একটি সাধারন অসুখ। দেশের অধিকাংশ মানুষই এই রোগে ভুগে থাকেন। কিন্তু এই রোগটি হল, নানান অন্যান্য সমস্যার সুচনা স্বরূপ। তাই এই রোগটি প্রায় অধিকাংশেরই হয় বলে, সাধারন ভাবা উচিত নয়। এটি অবশ্যই একটি জটিল সমস্যা। তাই এই রোগের আশংকা হলে, দ্রুত তা নির্ণয় করা প্রয়োজন,
Fasting Blood Glucose: এই পরীক্ষাটি সকালে নাস্তার আগে খালি পেটে করতে হয়। এর স্বাভাবিক মাত্রা ৬.১ মিলি মোল/লিটার বা তার কম।
2 Hour After Breakfast: এই পরীক্ষাটি নাশতা করার দুই ঘন্টা পর করতে হয়। এর স্বাভাবিক মাত্রা ১০ মিলি মোল/লিটার বা তার কম।
Random: এই পরীক্ষাটি দিনের যেকোনো সময় করা যেতে পারে। এর স্বাভাবিক মাত্রা ৫.৫ থেকে ১১.১ মিলি মোল/লিটার।
2 Hour After Breakfast: এই পরীক্ষাটি নাশতা করার দুই ঘন্টা পর করতে হয়। এর স্বাভাবিক মাত্রা ১০ মিলি মোল/লিটার বা তার কম।
Random: এই পরীক্ষাটি দিনের যেকোনো সময় করা যেতে পারে। এর স্বাভাবিক মাত্রা ৫.৫ থেকে ১১.১ মিলি মোল/লিটার।
Oral Glucose Tolerance Test (OGTT): যাদের খানি পেটে FBG ৬.১ এর বেশী কিন্তু ৭.০ মিলি মোল/ লিটারের কম কিংবা দিনে যে কোন সময় ৫.৫ এর বেশী কিন্তু ১১.১ মিলি মোল/ লিটারের কম, তাদের এ পরীক্ষাটি করা খুবই জরুরি। কারন এই পরীক্ষার মাধ্যমে কারো ডায়বেটিস আছে কি নেই, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এই পরীক্ষার জন্য রোগীকে খালি পেটে রক্ত দিতে হবে। এরপর ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ পানিতে মিশিয়ে খেতে হবে এবং ঠিক দুই ঘন্টা পর আবার রক্ত দিতে হবে। এই দুই ঘন্টা রোগী অন্য এ পরীক্ষায় যে রোগীর খালী পেটে ৭.০ মিলি মোল/লিটারের চেয়ে বেশি এবং দুই ঘন্টা পর ১১.১ মিলি মোল/লিটারের চেয়ে বেশি হবে তাকে নিশ্চিত ডায়াবেটিক রোগী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে। গ্লাইকোলাইলেটেড হিমোগ্লোবিন এ পরীক্ষার মাধ্যমে আপনার রক্তে গত ৪ মাসের গ্লুকোজের মাত্রার একটা ধারণা পাওয়া যাবে। এ পরীক্ষাটি খালি পেটে অথবা খাওয়ার পর যে কোন অবস্থায় করা যায়। এর স্বাভাবিক মাত্রা ৭% নিচে থাকা বাঞ্চনীয়।কোন খাবার খেতে পারবে না।
দায়বেটিস একটি অত্যন্ত জটিল সমস্যা, তাই এর লক্ষন ধরা দিলে, বা নিজে আশংকা করলে দ্রুত নির্ণয়ের ব্যবস্থা নিন। এবং সুস্থ থাকুন।
ডায়বেটিস কি এবং প্রতিরোধে আমাদের করনীয়
ডায়বেটিস কি?
ডায়বেটিস হলো রক্তের উচ্চ গ্লুকোজ জনিত স্বাস্থ্য সমস্যা। তেল ছাড়া রেলগাড়ি নামের যন্ত্রটি চলে না। মানবদেহ এক ধরনের যন্ত্র। আর এই যন্ত্রের তেল হচ্ছে গ্লুকোজ নামের একটি পদার্থ। রেলগাড়ির তেল জ্বালাতে যেমন অক্সিজেন প্রয়োজন, তেমনি আমাদের দেহের গ্লুকোজকে কাজে লাগাতে হলে ইনসুলিন নামের একটি পদার্থের প্রয়োজন। ইনসুলিনের কাজ হলো রক্ত থেকে গ্লুকোজের কণাগুলোকে টেনে এনে দেহের কোষে দেওয়া। এই ইনসুলিন তৈরি হয় অগ্ন্যাশয় থেকে। যখন অগ্ন্যাশয় যথেষ্ট পরিমাণ ইনসুলিন তৈরি করতে না পারে অথবা তৈরি হওয়া ইনসুলিন দেহ ঠিকমত ব্যবহার করতে না পারে তখনই রক্তে বাড়তে থাকে গ্লুকোজ। আর এর ফলে দেহে তৈরি হয় নানা অসামঞ্জস্য। এর নাম ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগ।
ডায়াবেটিস রোগী যে খাদ্য গ্রহন করছে তা থেকে তৈরি হচ্ছে গ্লুকোজ। আর এই গ্লুকোজের সবটুকু তার দেহে ব্যবহার হচ্ছে না, অর্থাৎ তার রক্তে মিশে থাকছে অতিরিক্ত গ্লুকোজ । এতে করে তার রক্ত হয়ে যাচ্ছে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘন। এই ঘন রক্ত চিকন চিকন রক্তনালীর মধ্য দিয়ে চলাচল করতে বাঁধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। এবং তা আস্তে আস্তে বন্ধ করে দিচ্ছে রক্ত চলাচলের পথ। আর যে পথে রক্ত পৌঁছাবে না সে পথে কোনো অক্সিজেনও পৌঁছায় না। ফলে অক্সিজেনের অভাবে শরীরের ভিতরকার কোষ বাঁচতে পারে না। তার মানে কতগুলো টিস্যুর নির্ঘাৎ মৃত্যু। এমন করে অঙ্গহানির পথে এগোবে শরীর যন্ত্র। অতিরিক্ত গ্লুকোজ মেশা ঘন রক্ত ছাকতে গিয়ে ধীরে ধীরে কিডনি বিকল হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, একে একে সব অঙ্গ বিকল হয়ে মৃত্যু ঘনিয়ে আসবে অসম্ভব দ্রুতগতিতে।
ডায়বেটিস যে শুধু বয়স্ক ব্যাক্তিদের হয় তা নয়। শিশুদেরও হতে পারে ডায়বেটিস।ইদানীংকালে শারীরিক কর্মকাণ্ড (খেলাধুলা, ব্যায়াম ইত্যাদি) কমে যাওয়ার কারণে অনেক অল্পবয়সী শিশু-কিশোরদেরও ডায়বেটিস হচ্ছে। সুষম খাদ্য এবং ব্যায়াম চর্চার অভাবে ডায়বেটিস এ আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে ১৫ হাজারের বেশি শিশু ডায়বেটিস বা বহুমুত্র রোগে ভুগছে। ডায়বেটিসে আক্রান্ত একজন বয়সী ব্যক্তির মধ্যে যে ধরণের উপসর্গ দেখা দেয় তার সবই শিশুরোগীদের মধ্যেও দেখা দেয়।
ডায়বেটিস এর প্রকারভেদঃ
ডায়বেটিস ২ রকম।
ডায়বেটিস ২ রকম।
টাইপ ১ ডায়বেটিস খুব দ্রুত উপসর্গ দেখায় এবং খুব দ্রুত ডেভেলপ করে, সাধারণত সপ্তাহ দুই-তিনেকের মধ্যে। উপসর্গগুলো তাড়াতাড়ি চলেও যায় যদি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা যায়।
টাইপ ২ ডায়বেটিস খুব ধীরে ধীরে শরীরে বাসা বাঁধে, কয়েক বছর ধরে। কেবলমাত্র নিয়মিত মেডিক্যাল চেকআপ করানোর মাধ্যমেই তা ধরা পড়া সম্ভব। নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখলে উপসর্গগুলো দূর করা সম্ভব।
উপসর্গঃ
প্রধান উপসর্গসমূহের মধ্যে যেগুলো সাধারণত দেখা যায়ঃ
প্রধান উপসর্গসমূহের মধ্যে যেগুলো সাধারণত দেখা যায়ঃ
- ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ পাওয়া, বিশেষ করে রাতে।
- ঘন ঘন তৃষ্ণা পাওয়া।
- খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া।
- হঠাৎ করে দ্রুতহারে ওজন হ্রাস পাওয়া।
- যৌনাঙ্গে চুলকানি এবং ফাঙ্গাল ইনফেকশান দেখা দেয়া।
- শরীরের কোথাও কেটে ছিড়ে গেলে, খুব আস্তে ধীরে ক্ষত শুকানো।
- ঝাপসা দৃষ্টি।
ডায়বেটিস হবার সম্ভবনা কাদের বেশীঃ
যাদের বংশে ডায়বেটিস রোগ আছে তাদের টাইপ ১ ডায়বেটিস হবার সম্ভবনা বেশী। এছাড়া টাইপ ২ ডায়বেটিস হবার সম্ভবনা বেশী হয় বয়সের সাথে - বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডায়বেটিসের সম্ভবনা বেশী হয়।
যাদের বংশে ডায়বেটিস রোগ আছে তাদের টাইপ ১ ডায়বেটিস হবার সম্ভবনা বেশী। এছাড়া টাইপ ২ ডায়বেটিস হবার সম্ভবনা বেশী হয় বয়সের সাথে - বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডায়বেটিসের সম্ভবনা বেশী হয়।
ক. এশিয়ান এবং আফ্রিকানদের ডায়বেটিসের সম্ভবনা বেশী।
খ. একজন মা যখন বেশী ওজনের সন্তান গর্ভে ধারন করেন তখন তার ডায়বেটিসের সম্ভবনা বেশী ....
গ. ওজন বেশী যেমন পুরুষের কোমড়ের মাপ ৩৫ ইন্চির বেশী এবং মহিলাদের ৪০ ইন্চির বেশী হলে ডায়বেটিসের সম্ভবনা বেশী দেখা যায়।
ঘ. অলস জীবনযাপন করলে ডায়বেটিসের সম্ভবনা বেশী থাকে।
প্রতিরোধঃ
কিছু কিছু নিয়ম পালন করলে ডায়বেটিস থেকে সাবধানে থাকা যায়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র কয়েকটি সহজ উপায় চর্চা করলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানো যায় ৮০ শতাংশ।
কিছু কিছু নিয়ম পালন করলে ডায়বেটিস থেকে সাবধানে থাকা যায়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র কয়েকটি সহজ উপায় চর্চা করলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানো যায় ৮০ শতাংশ।
১.স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়াঃ অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড (বার্গার, স্যান্ডউইচ, পিজা, শর্মা, চিপস, ফ্রেঞ্চফ্রাইজ ইত্যাদি), কোমল পানীয় এবং চকলেটসহ যেকোনো মিষ্টি খাবারেই ডায়বেটিসের ঝুঁকি বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। এগুলো থেকে আপনার সন্তানকে দূরে রাখুন এবং তাদের এসব খেতে নিরুৎসাহিত করুন, সহজ ভাষায় এর অপকারিতা বর্ণনা করুন। ঘরের খাবার খাওয়ার অভ্যেস করুন। এবং প্রতিদিনের খাবারের চার্টে প্রচুর ফল ও শাকসবজি রাখুন। প্রতিদিন নির্দ্দিষ্ট সময়ে খাওয়ার অভ্যাস করুন।
২.নিজে নিয়ম করে দিনে অন্তত ২০ মিনিট ব্যায়াম করুন, সাথে আপনার সন্তানকেও বলুন আপনার সাথে যোগ দিতে। আপনার উৎসাহই পারে তাদের সুস্থ রাখতে।
৩.স্বাভাবিক দেহ ওজন বজায় রাখা(বি এম আই ১৮.৫- ২৪.৯ এর মধ্যে রাখা)। স্বাভাবিক ওজনের পুরুষের ৭০ শতাংশ ঝুকি কম থাকে এবং স্বাভাবিক ওজনের নারীদের ডায়াবেটিস হওয়ার অশঙ্কা ৭৮ শতাংশ কম।
৪. ধূমপান করে থাকলে বর্জন করুন এবং মদ্যপান পরিহার করুন।
৫.বাসায় একটি ডায়বেটিস পরিমাপের যন্ত্র কিনে নিতে পারেন, যাকে ইংরেজিতে বলে গ্লুকোমিটার। ইদানীং বাজারে সস্তায় এগুলো পাওয়া যায়। নিয়ম করে, মাসে অন্তত একবার পরিবারের সবার ডায়বেটিস পরীক্ষা করুন।
অনেক ডায়বেটিস রোগীকেই দেখা যায় নিয়ন্ত্রণের জন্য ইনসুলিন নিতে। ডাক্তারের সাথে পরামর্শ না করে অবশ্যই ইনসুলিন নেবেন না! পুণরায় বলছি, ডাক্তারের সাথে পরামর্শ না করে অবশ্যই ইনসুলিন নেবেন না!যাদের ইতোমধ্যে ডায়বেটিস আছে, এবং যারা প্রেস্ক্রাইবড ইনসুলিন নিচ্ছেন, তারা দীর্ঘসময় ধরে খালি পেটে থাকবেন না। এতে হাইপোগ্লাইসেমিয়া (রক্তে গ্লুকোজ খুব বেশি কমে যাওয়া) হয়ে যেতে পারে যার ফলাফল খুব একটা সুখকর নয়।এই গাইডলাইনগুলো মেনে চললে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ বেশ ফলপ্রসূ হয়।
ভয়াবহতাঃ
ডায়াবেটিস স্বাস্থ্যের একটি বড় সমস্যা। কেউ কেউ একে অন্যান্য সকল মারাত্মক রোগের জননী বলে। কাঠের সাথে ঘুণের যে সর্ম্পক, শরীরের সাথে ডায়াবেটিসের সে সম্পর্ক। অর্থাৎ কাঠে ঘুণ ধরলে যেমন এর স্থায়িত্ব নষ্ট হয়ে যায়, তেমনি ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে তাড়াতাড়ি শরীর ভেঙ্গে পড়ে। আমাদের হার্ট, কিডনী, চোখ, দাঁত, নার্ভ সিষ্টেম-এ গরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস হতে পারে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে।অন্যদের তুলনায় ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তির হৃৎরোগ বা হার্ট অ্যাটাকের আশংকা থাকে ৪ গুণ বেশি।
ডায়াবেটিস স্বাস্থ্যের একটি বড় সমস্যা। কেউ কেউ একে অন্যান্য সকল মারাত্মক রোগের জননী বলে। কাঠের সাথে ঘুণের যে সর্ম্পক, শরীরের সাথে ডায়াবেটিসের সে সম্পর্ক। অর্থাৎ কাঠে ঘুণ ধরলে যেমন এর স্থায়িত্ব নষ্ট হয়ে যায়, তেমনি ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকলে তাড়াতাড়ি শরীর ভেঙ্গে পড়ে। আমাদের হার্ট, কিডনী, চোখ, দাঁত, নার্ভ সিষ্টেম-এ গরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস হতে পারে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে।অন্যদের তুলনায় ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তির হৃৎরোগ বা হার্ট অ্যাটাকের আশংকা থাকে ৪ গুণ বেশি।
ডায়বেটিসের যেসব পথ্য আছে এর মধ্যে ইনসুলিন এবং কিছু ওষুধ রয়েছে। এদের মূল কাজ রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে স্বাভাবিক মাত্রায় রাখা। তবে এসব ওষুধ কিছুটা ব্যয় বহুল।
ডায়বেটিসের রোগী ভালো থাকার উপায়:
ডায়বেটিস বা বহুমূত্র আজকের যুগের অন্যতম মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠেছে। এ রোগের সাথে খাদ্যের গভীর সর্ম্পক আছে সে কথাও সবাই জানেন। তাই এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কি ধরণের খাদ্য গ্রহণ করা উচিত সে ব্যাপারে আলোচনা করেছেন ঢাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ ডায়বেটিক হাসপাতাল বা বারডেমের সিনিয়র পুষ্টিবিদ খালেদা খাতুন।
আলোচনাটি পরিবেশন করা হলো :
ডায়বেটিস রোগের প্রকোপ বর্তমান কালে বেড়েছে। কেউ কেউ মনে করেন আংশকাজনক ভাবেই বেড়েছে। শহর কেন্দ্রিক মানুষের তুলনামূলক অলস জীবন যাপন আর এর সাথে অতিরিক্তি কথিত 'সুখাদ্য' এই রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি করেছে। ডায়বেটিস হলে দেহে পরিমাণমতো ইনস্যুলিন তৈরি হয় না বা তার ঘাটতি দেখা দেয়। এ কারণে দেহ চিনি জাতীয় খাদ্যকে ভেংগে আর হজম করতে পারে না। রক্তে চিনির মাত্রা নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে বেড়ে যায়। বহুমুত্রের পথ ধরে রোগীর দেহে হৃৎরোগ, কিডনি রোগসহ নানা জটিল রোগ দেহে বাসা বাধতে পারে। এ কারণে ডায়বেটিসকে রোগের জননী বলা হয়। ডায়বেটিসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে, প্রথমেই খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অর্থাৎ চিনি জাতীয় খাদ্য বর্জন করতে হবে। শর্করা জাতীয় খাবার গ্রহণে সতর্ক হতে হবে। অতিরিক্ত তেল চর্বি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। একই সাথে অতিরিক্ত ভাজা-পোড়া খাওয়া যথাসাধ্য বন্ধ রাখতে হবে। নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। প্রয়োজনে সুনির্দিষ্ট ওষুধ গ্রহণ করতে হবে। তবে সাধারণভাবে চিকিৎসকরা মনে করেন, কেউ যদি খাদ্য গ্রহণে সতর্ক না হোন এবং নিয়মিত ব্যায়াম না করেন তবে তিনি যতই ওষুধ গ্রহণ করুন না কেন, তার রক্তের চিনির মাত্রা হ্রাস পাবে না, বহুমুত্র নিয়ন্ত্রিত হবে না। একই সাথে ডায়বেটিসের পথ ধরে অন্যান্য রোগের আক্রমণের আশংকা কমবে না। একজন সাধারণ মানুষ যে পরিমাণ শর্করা জাতীয় খাদ্য অর্থাৎ ভাত বা রুটি খান ডায়বেটিসের রোগী মোটেও সে পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করতে পারবেন না। তার যে পরিমাণ ক্যালোরির প্রয়োজন পড়ে তার মধ্যে ষাট থেকে সত্তর শতাংশ শর্করা খাদ্য হওয়া উচিত। এরপর বাকি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ প্রোটিন বা আমিষ এবং ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ফ্যাট বা স্নেহ জাতীয় খাবার থেকে অর্জন করা উচিত। বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে অনেকের জন্য খাদ্যের যোগাড় করাই মুশকিল হয়ে দাড়ায়। খাদ্য সমস্যার কথা মনে হলেই এ দেশে আমিষ বা প্রোটিন ঘাটতির কথাই বেশি আসে। তাই এ সব দেশের আমিষ সমস্যার কথা মনে রেখেই রোগীর খাদ্যের আমিষের কথাটি বলা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে একটি মাপকাঠিও পাওয়া গেছে। সাধারণ ভাবে পূর্ণ বয়সী মানুষের দেহের ওজন যতো কিলোগ্রাম হবে তত গ্রাম আমিষ তাকে খেতে দিতে দিতে হবে। অর্থাৎ কারো ওজন যদি ৭৫ কিলোগ্রাম হয় তবে তাকে ৭৫ গ্রাম আমিষ গ্রহণ করতে হবে। তবে শিশুদের বেলায় এই পরিমাণ একটু বাড়বে। অর্থাৎ তাকে প্রতি কিলো ওজনের জন্য ১ দশমিক ২ গ্রাম আমিষ সরবরাহ করতে হবে। অর্থাৎ কোনো শিশুর ওজন যদি ১৮ কিলোগ্রাম হয় তবে তাকে ২১ গ্রাম আমিষ গ্রহণ করতে হবে। তবে গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটবে। যে সব মায়ের ডায়বেটিস আছে তারা পরিপূর্ণ ভাবে তা নিয়ন্ত্রণ না করে তাদের গর্ভ ধারণ করা মোটেও উচিত হবে না। গর্ভে সন্তান থাকাকালীন অবস্থায় এ ধরণের মায়ের খাদ্য তালিকায় চিনি জাতীয় খাবার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ ছাড়া আর কিছু খাবার নিয়ন্ত্রণ করার কোনো দরকার নেই। অন্যদিকে সন্তান গর্ভে থাকার কারণে অনেকের মধ্যে বহুমুত্রের উপসর্গ দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে সাধারণ ভাবে সামান্য সতর্কতা ছাড়া বিশেষ কোনো নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন পড়ে না। ডায়বেটিস রোগীর খাবারের সময় সূচি রক্ষা করা একান্তভাবে প্রয়োজনীয়। এ ধরণের রোগীদের প্রতি ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘন্টা অন্তর অন্তর তাকে খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। খাদ্যের এই সময় সূচি সঠিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তার পরিণাম ভাল হবে না। ডায়বেটিস রোগী চিকিৎসা এবং আনুষাঙ্গিক নিয়ম মানার ফলে যে সুফল অর্জন করতে পারবেন কেবল মাত্র খাদ্যের নিয়ম না মানার কারণে তা ভেস্তে যেতে পারে। এ্ই নিয়ম না মানার কারণে ডায়বেটিসের রোগীর রক্তে চিনির পরিমাণ অতি মাত্রায় কমে যেতে পারে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে হাইপো গ্লাইসিমিয়া বলা হয়। অথবা খাদ্য গ্রহণের পর রক্তে চিনির পরিমাণ অতি মাত্রায় বৃদ্ধি পেতে পারে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এ অবস্থাকে হাইপার গ্লাইসিমিয়া বলা হয়। তাই যদি তিন থেকে সাড়ে তিন ঘন্টা পর পর যদি খাবার গ্রহণ করা হয় তবে রক্তে চিনির এই মাত্রা ওঠা-নামা করার সুযোগ পায় না। এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজনীয় মনে করছি, তা হলো বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও ভেষজ চিকিৎসার প্রতি অনেকের গভীর বিশ্বাস রয়েছে। গাছ-গাছড়ায় রোগ সারিয়ে তোলার মতো উপকরণ বা উপাদান রয়েছ এ কথা সবাই স্বীকার করবেন। তবে ভেষজ চিকিৎসার জন্য যে সব গাছ-গাছড়ার নাম বলা হয় তাদের কার্যকারিতা, রোগ সারিয়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রা এবং দেহের উপর এ সব ভেষজের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে সঠিক গবেষণা আজো হয় নি। কোনো ভেষজকে আধুনিক ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য এরকম বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশে অনেকেই বলেন, মেথি, করলা, রসুন, পেঁয়াজ, জামের বিচি থেকে শুরু করে নানা উদ্ভিদের বহুমুত্র সারিয়ে তোলার বা নিয়ন্ত্রণ করার মতো উপাদান আছে। এ কথা কতোটি সত্যি তা আজও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। তাই চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুমোদিত ওষুধের বিকল্প হিসেবে এ ভেষজ উপাদান ব্যবহার করা ঠিক নয়। বরং তা অনেক ক্ষেত্রে রোগীর জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। মনে রাখতে হবে ডায়বেটিস কখনোই সারে না। এ রোগ সারাবার কোনো ওষুধ এখন পর্যন্ত কেউ উদ্ভাবন করতে পারেন নি। তবে ডায়বেটিস রোগকে নিয়ন্ত্রণে রেখে দীর্ঘদিন মান সম্পন্ন জীবন যাপন করা সম্ভব। আজকের দিনে ডায়বেটিসের যে চিকিৎসা হয় তা রোগ নিরাময় বা রোগ সারিয়ে তোলা জন্য নয়। রোগী যেনো সুস্থ সক্রিয় জীবনযাপন করতে পারেন তার জন্যেই এই চিকিৎসা করা হয়। এই চিকিৎসার ক্ষেত্রে খাদ্য এবং জীবন আচারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই ডায়বেটিসের রোগীকে সুস্থ জীবন যাপন করতে হলে নিয়ম মেনে খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। আজকের যুগের অনেক চিকিৎসকই বলেন, নিয়ম মেনে খাবেন এবং দৈনিক ব্যায়াম করবেন তা হলেই ডায়বেটিসের রোগী ভালো থাকবেন।






0 comments:
Post a Comment