মেনিনজাইটিস জীবাণু দ্বারা বা অন্য কোনো উপায়ে সৃষ্ট মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডের পর্দা_ মেনিনজেসের তীব্র ইনফেকশন। মেনিনজাইটিসের ক্ষেত্রে প্রদাহ মস্তিষ্কের খুব কাছাকাছি হওয়ায় মৃত্যু ঝুঁকি অনেক বেশি। বিনা চিকিৎসায় মেনিনজাইটিসে মৃত্যুহার ৭০ শতাংশেও বেশি। বিশ্বে প্রতি মিনিটে একজন রোগী মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয় আর প্রতি ২৪ ঘণ্টায় মারা যায় ১৩৭ জন। মেনিনজাইটিসের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া প্রতি পাঁচজন রোগীর অন্তত একজনের চিরস্থায়ী অঙ্গহানি বা মস্তিষ্কের সমস্যা বা বধিরতা বা দৃষ্টিশক্তি হারানোর মতো করুণ পরিণতি বরণ করতে হয়।
মেনিনজাইটিসের লক্ষণ : অনেক ক্ষেত্রে লক্ষণ প্রকাশের ১২ ঘণ্টার মধ্যেই মেনিনজাইটিসের রোগী মারা যায়। তবে সব ক্ষেত্রে এ রকম হয় এমনটি বলা যাবে না। মেনিনজাইটিসের প্রধান লক্ষণগুলো হলো_ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, গলার মাংস শক্ত হয়ে যাওয়া, স্মৃতি বিভ্রম, বমি বা বমি বমি ভাব, আলোর দিকে তাকাতে না পারা, অস্বস্তি, শরীরের বিশেষত পায়ের পেছনে ও নিতম্বে ঘায়ের মতো বিশেষ দাগ, অচেতন অবস্থা, তন্দ্রাভাব, শরীরের ভারসাম্য হারানো প্রভৃতি। উল্লেখ্য, বয়সভেদে এ উপসর্গগুলোর কিছুটা ভিন্নতা দেখা যেতে পারে।
রোগের কারণ : অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেনিনজাইটিসের কারণ হলো বিভিন্ন প্রকারের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ফাংগাস, প্রোটোজোয়া প্রভৃতি। তবে বিভিন্ন ধরনের ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় বা ক্যান্সারের কারণেও মেনিনজাইটিস হতে পারে।
ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিস : বয়সভেদে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিসের জন্য দায়ী। সদ্যোজাত থেকে শুরু করে ৩ মাস বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে প্রধানত গ্রুপ-বি স্ট্রেপটেকক্কি ও লিস্টেরিয়া মনোসাইটোজিনেসিস দ্বারা মেনিনজাইটিস হয়ে থাকে। ২ বছরের পরবর্তী শিশুদের মেনিনজাইটিসের জন্য দায়ী নাইসেরিয়া মেনিনজাইটিডিস, স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনিয়া এবং হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি। বড়দের ৮০ শতাংশ ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিসের কারণ নাইসেরিয়া মেনিনজাইটিডিস ও স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনিয়া। পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তির ক্ষেত্রে লিস্টেরিয়া মনোসাইটোজিনেসিসজনিত মেনিনজাইটিসের হার অনেক বেশি। যক্ষ্মা রোগীদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস এবং রোগ জটিলতার কারণে টিবি মেনিনজাইটিস হয়ে থাকে।
ভাইরাল মেনিনজাইটিস : ভাইরাসজনিত মেনিনজাইটিস ব্যাকটেরিয়াজনিত মেনিনজাইটিসের চেয়ে কম ভয়ঙ্কর। কম বয়সী শিশু এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের এ ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। ভাইরাল মেনিনজাইটিস মাম্পস, মিসেলস, পক্স ভাইরাস এবং বিশেষ ধরনের মশাবাহিত ভাইরাসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে।
ফাংগাল মেনিনজাইটিস : রোগ প্রতিরোধকারী ক্ষমতা হ্রাসের ওষুধ সেবনকারী, এইডস বা এইচআইভি আক্রান্ত রোগী ও বয়স্করা ফাংগাল মেনিনজাইটিসের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ফাংগাল মেনিনজাইটিসের প্রকোপ আফ্রিকা মহাদেশে সবচেয়ে বেশি এবং তা ২০-২৫ শতাংশ এইডস আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর কারণ।
প্যারাসাইটিক মেনিনজাইটিস : এ ধরনের মেনিনজাইটিস পরজীবী জীবাণুর প্রভাবে দেখা দিয়ে থাকে।
জীবাণুবিহীন মেনিনজাইটিস : জীবাণুর বাইরেও কিছু কারণে মেনিনজাইটিস হতে পারে। ক্যান্সারের বিস্তৃতি, কিছু বিশেষ ওষুধ সেবন (ব্যথানাশক ওষুধ, ইমিউনোগ্গ্নোবিন), সারকোডিয়াসিস, কানেকটিভ টিস্যুর সমস্যাজনিত রোগ, সিস্টেমিক লুপাস ইরাথেমেটোসাস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাইগ্রেন থেকেও মেনিনজাইটিস হতে পারে, যদিও এ হার অনেক কম।
মেনিনজাইটিস শনাক্তকরণ : রোগের লক্ষণের পাশাপাশি মেনিনজাইটিস থাকার ব্যাপারে সন্দেহ হলে ব্লাড কালচার এবং রক্তের রুটিন পরীক্ষার মাধ্যমে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়। সেরেব্রো স্পাইনাল ফু্লইড (সিএসএফ) মস্তিষ্কের রসের রু.টিন, বায়োকেমিক্যাল এবং কালচার টেস্ট করার মাধ্যমে মেনিনজাইটিস সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়া যায়। যক্ষ্মা থেকে মেনিনজাইটিস হলে এ রোগের প্রাথমিক লক্ষণ তদনুযায়ী পরীক্ষার পাশাপাশি সিএসএফ কালচার, পিসিআর পরীক্ষা করা হয়ে থাকে।
যেভাবে ছড়ায় : সংস্পর্শে মেনিনজাইটিস খুব দ্রুত ছড়িয়ে যায় না। তবে ভাইরাল ও ব্যাকটেরিয়াল, টিবি মেনিনজাইটিস কফ এবং নাক ও গলার নিঃসরণের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। একজন স্বাভাবিক মানুষ মেনিনজাইটিস রোগের কোনো উপসর্গ ছাড়াই এ রোগের জীবাণু বহন করতে পারে, যা তার ব্যবহৃত গ্গ্নাস, থালা-বাসন বা সিগারেট ভাগাভাগির মাধ্যম অন্যজনের কাছে সংক্রমিত হতে পারে। ভাইরাল মেনিনজাইটিস মলমূত্রের মাধ্যমে একজনের কাছ থেকে অন্যজনে ছড়াতে পারে।
মেনিনজাইটিস প্রতিরোধ ও টিকা : মেনিনজাইটিস প্রতিরোধে বাংলাদেশে শিশুদের দেড় মাস বয়সের পর থেকে টিকাদান কর্মসূচিতে হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি-এর টিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মেনিনগোকক্কাস ভ্যাকসিন 'গ্রুপ-এ, সি, ডবি্লউ-১৩৫ এবং ওয়াই' মেনিনজাইটিসের বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যা সর্বোচ্চ রকমের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে। যেসব দেশে মেনিনগোকক্কাস গ্রুপ-সি-এর ভ্যাকসিন ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানে মেনিনজাইটিসের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গিয়েছে। বাংলাদেশেও মেনিনজাইটিসের বিরুদ্ধে কার্যকর ও মানসম্পন্ন ভ্যাকসিন (গঊঘঠঊঙ, ঘড়াধৎঃরং) বাজারে প্রচলিত আছে, যা সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা দেয়। মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত রোগীর নিকটতম আত্মীয়স্বজন, সেবাদানকারী সেবিকা, চিকিৎসকদের চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে রোগ প্রতিরোধে সিপ্রোফ্লোক্সাসিন অথবা রিফামপিসিন সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।






0 comments:
Post a Comment