রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনার তরী কবিতার শেষ স্তবকটি মনে পড়ে? একটি অপসৃয়মান তরণীর মতো কবি ক্রমশ একাকিত্বের অতলে হারিয়ে যাচ্ছেন। জীবনে উপান্তে পৌঁছে তার সারা জীবনের সমস্ত সম্পদ নিয়ে চলে যাচ্ছে সাধের সোনার তরী। নিঃস্ব নিঃসঙ্গতায় ন্যূব্জ এমন ভয়ঙ্কর সুন্দর দৃশ্যকল্প পৃথিবী-সাহিত্যে বিরল। কিন্তু এই একাকিত্বের রোম্যান্টিকতার আড়ালে রয়েছে এক নীরব প্রাণঘাতক। যে শুধু আপনার মনকেই নয়, শরীরটিকেও গ্রাস করবে নির্জনতার অন্ধকারে।
আমেরিকার একদল মনস্তত্ত্ববিদ এমনটাই দাবি করেছেন। অকাট্য যুক্তি হিসেবে তারা দেখিয়েছেন সদ্য সমাপ্ত এক গবেষণার হাড়-হিম-করা কিছু উপাত্ত। সেই পরিসংখ্যান বলছে, নিঃসঙ্গ মানুষদের অবসাদজনিত মৃত্যুর সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি। এর আরও মারাত্মক প্রভাব পড়ে প্রবীণ নাগরিকদের ওপর। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের মনস্তত্ত্বের অধ্যাপক জন ক্যাসিওপো সাম্প্রতিক একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে বৃদ্ধ বয়সে একাকিত্ব ডেকে আনতে পারে অনিদ্রা, রক্তচাপ বৃদ্ধি। উপরন্তু একা মানুষদের বার্ধক্যজনিত সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটিও উত্তরোত্তর হ্রাস পেতে পারে। এমনকী শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং যাবতীয় ভাল-ছেলে সুলভ প্রয়াসও কোন কাজে দেবে না এই একাকিত্বের দৈত্যের সঙ্গে মোকাবিলায়। সুতরাং আরও বেশি দিন সুস্থভাবে বেঁচে থাকার একটাই মূলমন্ত্র- হাত বাড়াও, বন্ধু হও।
তবে এও সত্যি, বয়সের দ্বিতীয়ার্ধে এসে নিঃসঙ্গতাকে দূর করা খুব সহজসাধ্য নয়। এ হলো জীবনের এমন একটা পর্যায় যখন বাবা-মা হাত ছেড়ে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। নিকটজনেরাও একে একে হারিয়ে যাচ্ছেন তারাখসার মতো। একাকিত্ব তাই শীতল কুয়াশার মতো জমে থাকে রাতের বিছানায়। মোবাইল ফোনটি নিষ্প্রাণ নিথর হয়ে পড়ে থাকে সারাদিন। যদি বা ক্বচিৎ কদাচিৎ বাজে, ছুটে গিয়ে ধরলে কোন মৃদুভাষিণী ঋণ দেবার জন্য আকুতি-মিনতি করে। বিয়ে বাড়িতে নলেন গুড়ের রসগোল্লার দিকে ঘেঁষা নিষেধ, বসন্তকালেও হনুমান টুপি পরে থাকতে হয়, নাইট শো-তে সিনেমা দেখা নিষেধ, দুর্গাপূজার ভাসানে নাচা নিষেধ- নতুবা সকলে তকমা দেবে- ‘বিকৃতমনা’। অতএব তখন নিঃসঙ্গতার অস্তাচলে ক্রমশ ডুবে যাওয়া ছাড়া গতি নেই।
অন্য একটি গবেষণায় বার্ধক্যজনিত-রোগ-বিশেষজ্ঞ (জেরিট্রিসিয়ান) অধ্যাপক কার্লে পারিসিনোটো জানাচ্ছেন, ৮০.৫% প্রবীণ মানুষ বন্ধু-পরিবেষ্টিত হয়ে সুখী জীবনযাপন করছেন, যেখানে নিঃসঙ্গ প্রবীণদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৪.৫%-এ।
তবে ক্যাসিওপা তার নতুন গবেষণা লব্ধ তত্ত্বে একথা পরিষ্কার করেছেন যে, একাকিত্ব এবং সম্পর্কহীনতা সমার্থক নয়। কোনও মানুষ যুগল-জীবন যাপন করতে করতেও একা হয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ স্বামী, স্ত্রী, প্রেমিক, প্রেমিকার সঙ্গে বসবাস করা কালীনও কেউ নিঃসঙ্গতা অনুভব করতে পারেন। যার উল্টোটাও সত্য।
তাহলে উপায় কী? জীবনের শেষবেলায় এসে অবহেলা এবং নিঃসঙ্গতাকে হারিয়ে জীবনকে সুন্দর এবং দীর্ঘায়িত করা যায় কীভাবে? নাহ্, কেউ আপনার ডাক শুনে না এলে একলা চলার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা বেশ ঝুঁকির হয়ে যাবে। পরিসংখ্যান তো তেমনটাই ইঙ্গিত করছে। আবার, আরেক মনস্তত্ত্ববিদ গাই উইন্চ্ তার বই ‘Emotional First Aid’–এ এই সমস্যার সুরাহা করতে ‘meaningful connection’ অথবা অর্থবহ যোগাযোগের ওপর জোড় দিয়েছেন। কোনও যোগাযোগ বা বন্ধুত্ব তখনই আপনার কাছে অর্থবহ হয়ে উঠবে যখন সেই বন্ধুর মধ্যে আপনি আপনার উৎসাহের কিছু একটা খুঁজে পাবেন। যেমন এক রকেট সায়েন্টিস্ট, যিনি জীবনে কখনও রান্না ঘরে ঢোকেননি এবং একজন শেফ যিনি ক্লাস সেভেনে অঙ্কের বই লুকিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন জানলা দিয়ে, তখনই কোনও অর্থবহ যোগাযোগ তৈরি করতে পারবেন, যদি দুজনেই প্রীতি জিন্টার ডাই হার্ট ফ্যান হন!
সত্যি বলতে কী, এরকম বন্ধুত্ব গড়ে তোলাটা সোশ্যাল নেটওয়ার্কের জমানায় অসম্ভবও কিছু নয়। ফেসবুক তো আছেই, কত ডেটিং সাইট-ও আছে। এছাড়া আছে নানান ক্লাব। দরকার শুধু মনটাকে তরতাজা রাখা, যাতে বন্ধুত্বের ডাকে আপনি সাড়া দিতে পারেন সহজেই।– ওয়েবসাইট।
0 comments:
Post a Comment