রায়না (২৬) বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা। ৬ মাসের গর্ভবতী। অফিসের কাজে অনেক চাপ। মেটারনিটি লিভ নিলেন। নতুন অতিথিকে নিয়ে পরিবারের সদস্যদের আনন্দের সীমা নেই। রায়নাকে কাজ করতে দেখলেই রাগ করেন শাশুড়ি। স্বামীও বেশ খোঁজখবর নেন। নিয়মিত চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করেন। ছোট ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ছেদ পড়ল নিয়মিত চেকআপে। বাড়ির ছোট ছেলের বিয়ে নিয়ে মশগুল হয়ে পড়ল পুরো পরিবার। কিন্তু হঠাৎ করেই রায়না অনুভব করলেন তার গর্ভস্থ শিশুর নড়াচড়া কম হচ্ছে। দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেন। অনিয়মিত চেকআপের জন্য রাগ করলেন চিকিৎসক। আর কয়েকদিন দেরি হলে শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হতো না বলে জানান তিনি। আল্লাহর রহমতে এ যাত্রায় রক্ষা পেলেন রায়না। চিকিৎসকের দেওয়া ব্যবস্থাপত্র মেনে চলায় নির্দিষ্ট সময়ে প্রসব করেন একটি সুস্থ-সবল শিশু। সবাই চান একটি সুস্থ শিশু। কিন্তু গর্ভকালীন সমস্যা হলে একটি সুস্থ শিশু অধরাই থেকে যায়। গর্ভাবস্থায় সমস্যা হচ্ছে কি-না তা বোঝার জন্য বেশকিছু লক্ষণ বা চিহ্ন আছে। এ লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
মাসিকের রাস্তায় রক্তপাত : গর্ভাবস্থায় যে কোনো সময় মাসিকের রাস্তা দিয়ে রক্ত পড়া কিন্তু সমূহ বিপদের লক্ষণ। বিভিন্ন কারণে রক্তপাত হতে পারে। গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসে অ্যাবরশন বা গর্ভপাত, একটোপিক প্রেগনেন্সি বা ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপিত না হয়ে অন্যত্র স্থাপিত হলে ও মোলার প্রেগনেন্সির কারণে রক্তপাত হতে পারে। শেষ তিন মাসে রক্ত গেলে হতে পারে অ্যাবরাপশিও প্লাসেন্টা। এ ক্ষেত্রে অমরা আগেই আলাদা হতে শুরু করে। অমরা বা প্লাসেন্টা ভ্রূণের জন্য অপরিহার্য। এটির মাধ্যমেই ভ্রূণ মায়ের শরীর থেকে পুষ্টি উপাদান ও অক্সিজেন পায় এবং নিজের বর্জ্য মায়ের দেহে অবমুক্ত করে। অমরা আলাদা হয়ে গেলে গর্ভস্থ শিশুর বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাই রক্তপাত যখনই হোক না কেন, দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন ।
বমি বমি ভাব ও বমি : বারবার বমি ও বমি বমি ভাব হলে গর্ভবতীরা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারেন না। এতে করে তারা সহজেই পানিশূন্যতা ও অপুষ্টিতে ভোগেন। ফলে গর্ভস্থ শিশুর বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুর বৃদ্ধি কমতে পারে ও জন্মগত সমস্যা হতে পারে, নির্ধারিত সময়ের আগেই শিশু ভূমিষ্ঠ হতে পারে। তবে গর্ভধারণের প্রথম তিন মাস গর্ভবতীদের একটু একটু বমি বমি ভাব হতেই পারে। যেটিকে মর্নিং সিকনেস বলে। তিন মাস পর এ সমস্যা আপনা আপনি ভালো হয়ে যায়। কিন্তু তিন মাসের পরও সমস্যা ভালো না হলে বা অতিরিক্ত বমি বমি ভাব কিংবা বমি হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। তিনি আপনার অবস্থা বুঝে ওষুধ দেবেন।
গর্ভস্থ শিশুর কম নড়াচড়া : গর্ভের শিশু যদি আগের তুলনায় নড়াচড়া কম করে বা নড়াচড়া একবারেই বন্ধ হয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে শিশুর বড় ধরনের কোনো সমস্যা হয়েছে। ঠিকমতো অক্সিজেন বা খাবার না পেলে কিংবা শিশু ডিসট্রেস বা চাপের মধ্যে থাকলে এমনটি হতে পারে। খাবার ও পুষ্টি সরবরাহকারী প্লাসেন্টা ঠিকমতো পুষ্টি সরবরাহ না করলে এ সমস্যা হয়। আপনার শিশুর নড়াচড়া কম হচ্ছে কি-না বোঝার জন্য খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ূন। পেটে হাত রেখে বোঝার চেষ্টা করুন ভ্রূণ কতবার নড়াচড়া করছে। যদি ২ ঘণ্টায় শিশুর নড়াচড়া ১০ বারের কম হয় তবে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সময়ের আগেই প্রসব ব্যথা : অনেক সময় নির্দিষ্ট সময়ের আগে প্রসব ব্যথা শুরু হয়ে শিশু ভূমিষ্ঠ হতে পারে। ৩৭ সপ্তাহ পুরো হলে প্রসবের সময় হয়েছে বলে ধরা হয়। ৩৪ সপ্তাহের আগে প্রসব হলে ফুসফুস গঠিত হয় না বলে শিশুকে বাঁচানো কষ্টকর হয়ে যায়। এ জন্য প্রসব ব্যথা সময়ের আগে হলে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ধরনের সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। তবে অনেক মায়ের ক্ষেত্রে প্রসব ব্যথার মতোই এক ধরনের ব্যথা হতে পারে, যেটিকে ফলস লেবার পেইন বা মিথ্যা প্রসব ব্যথা বলে। প্রথমবার মা হচ্ছেন এমন মায়েদের এটি বেশি দেখা যায়। প্রসব ব্যথা থেকে এটি আলাদা করা যায় সহজেই। এ ব্যথা শুরু হয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে না, এটি এক ঘণ্টার মধ্যে কমে যাবে বা একই থাকবে। জরায়ুর সংকোচন ও প্রসারণ দুই অবস্থায় এ ব্যথা থাকে। এ ব্যথা অতটা তীব্র নয়।
পানিভাঙা : সাধারণত প্রসবের আগমুহূর্তে পানি ভেঙে গিয়ে জরায়ুর সংকোচন করে শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। কিন্তু প্রসব ব্যথা শুরুর আগেই পানি ভাঙলে জটিল সমস্যা দেখা দেয়। শিশু নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ভূমিষ্ঠ হতে পারে। এ সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। এ ছাড়া প্রচণ্ড মাথাব্যথা, পেটব্যথা, চোখে দেখতে অসুবিধা, প্রচণ্ড জ্বর ও পায়ে পানি জমা, খিঁচুনি হলে গর্ভবতীকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করান।
ডো. রেজাউল করিম কাজল
সহকারী অধ্যাপক, গাইনী ও প্রসূতি বিভাগ, বিএসএমএমইউ, শাহবাগ






0 comments:
Post a Comment