কম্পিউটার বা কম্পিউটারের মতো এমন যন্ত্রপাতিতে নিয়মিত ও অনেকক্ষণ ধরে কাজ করলে চোখের বিভিন্ন সমস্যা ও উপসর্গ দেখা দিতে পারে- এই অবস্থাকে বলা হয় কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম।
সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে- আমেরিকার ১৪৩ মিলিয়ন লোক প্রতিদিন কম্পিউটারে কাজ করে থাকেন এবং তাদের ৮৮ শতাংশ লোকেরই সামান্য থেকে বেশি- বিভিন্ন মাত্রায় চোখের উপসর্গ রয়েছে। সুতরাং কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম সারা বিশ্বে একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিগণিত।
কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোমের উপসর্গগুলো
মাথাব্যথ্যা, চোখে ব্যথা, চোখ জ্বালাপোড়া করা, চোখের কান্তি রোধ করা, ঝাপসা দেখা বা মাঝে মাঝে দু’টি দেখা, ঘাড় ও কাঁধে ব্যথা কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোমের কারণ।
কম্পিউটারের অক্ষরগুলো ছাপার অক্ষরের মতো নয়। ছাপার অক্ষরগুলোর মধ্যভাগ এবং পার্শের ঘনত্ব একই রকম- এগুলো দেখার জন্য সহজেই চোখের ফোকাস করা যায়, অন্যদিকে কম্পিউটারের অক্ষরগুলোর মধ্যভাগ ভালো দেখা যায়; কিন্তু পার্শ্বভাগের ঘনত্ব কম হওয়ায় পরিষ্কার ফোকাসে আসে না। কম্পিউটারের অক্ষরগুলোর এই ফোকাসের অসমতার জন্য চোখের নিকটে দেখার যে প্রক্রিয়া বা অ্যাকোমোডেশন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। এভাবে দীর্ঘক্ষণ যাবৎ কম্পিউটারে কাজ করলে চোখের বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়।
কম্পিউটারের চশমা
সাধারণ লেখাপড়ার সময় ১র্৪র্ -১র্৬র্ দূরে পড়ার জন্য যে পাওয়ারের চশমা লাগে কম্পিউটারে কাজ করার সময় ১র্৮র্ -২র্৮র্ দূরে মনিটর রেখে সে পাওয়ার দিয়ে ভালো দেখা যায় না। চুবিশেষজ্ঞরা কম্পিউটারে কাজ করার জন্য বিশেষ পাওয়ারের চশমা দিয়ে থাকেন যার নাম কম্পিউটার চশমা বা Computer Eye Glass। পঁয়ত্রিশ বছরের কমবয়সী ব্যক্তিদের ইউনিফোকাল (Unifocal) বা শুধু একটি পাওয়ারের চশমা দিলেই চলে কিন্তু পঁয়ত্রিশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের জন্য কোনো কোনো সময় ওই ইউনিফোকাল চশমা দিয়ে তুলনামূলক নিকটে কপি পড়তে অসুবিধা হতে পারে, তাদের জন্য মাল্টি ফোকাল চশমা দিলে কপি পড়া এবং কম্পিউটার মনিটরে কাজ করার সুবিধা হয়।
কম্পিউটারে ভিশন সিনড্রোম থেকে মুক্তি পাওয়ার ৯টি উপায়
১) চক্ষু পরীক্ষা: কম্পিউটার ব্যবহারে আগে চক্ষু পরীক্ষা করে, চোখের কোন পাওয়ার থাকলে অবশ্যই চশমা ব্যবহার করতে হবে। চল্লিশোর্ধ্ব ব্যক্তিদের জন্য বিশেষভাবে তৈরী কম্পিউটার আই গ্লাস ব্যবহার করতে হবে।
২) সঠিক আলোর ব্যবহার : রুমের ভেতরে বা বাইরে থেকে আসা অতিরিক্ত আলো চোখের ব্যথার কারণ হতে পারে। বাইরে থেকে আলো এসে চোখে না লাগে বা কম্পিউটার স্ক্রিনে না পড়ে সে জন্যে পর্দা, ব্লাইন্ড ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরের আলো টিউবলাইট বা ফোরেসেন্ট বাল্বের আলো হলে এবং স্বাভাবিক অফিসের আলোর চেয়ে কিছুটা কম হলে চোখের জন্য আরামদায়ক।
৩) গ্লেয়ার কমানো : কম্পিউটার মনিটরের অ্যান্টি গ্লেয়ার স্ক্রিন ব্যবহার করে ও চশমায় অ্যান্টি রিফেকটিভ প্লাস্টিকের কাঁচ ব্যবহার করলে গ্লেয়ার কমানো যায়।
৪) কম্পিউটার মনিটরের ‘ব্রাইটনেস’ বাড়ানো বা কমানো: ঘরের আলোর সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে কম্পিউটার মনিটরের আলো কমানো বা বাড়ানো যাতে মনিটরে লেখাগুলো দেখতে আরামদায়ক হয়।
৫) ঘন ঘন চোখের পলক ফেলুন : কম্পিউটারে কাজ করার সময় চোখের পলক পড়া কমে যায়। এর ফলে চোখের পানি কমে যায় ও চক্ষু শুষ্কতা বা ড্রাই আই হতে পারে। এ অবস্থায় চোখ শুষ্ক মনে হবে। কাঁটাকাঁটা লাগবে। চোখের অস্বস্তি ও ক্লান্তি আসবে। কম্পিউটারে কাজের সময় ঘন ঘন চোখের পলক ফেলুন। এর পরও সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চোখের কৃত্রিম পানি (Artificial Tears) ব্যবহার করুন।
৬) চোখের ব্যায়াম : ৩০ মিনিট কম্পিউটারে কাজ করার পর অন্যদিকে দূরে তাকান। সম্ভব হলে ঘরের বাইরে কোথাও দেখুন এবং আবার নিকটে অন্য কিছু দেখুন। এভাবে চোখের বিভিন্ন ফোকাসিং মাংসপেশির ব্যায়াম হবে। এভাবে কয়েকবার করে আবার কিছুক্ষণ কাজ করুন।
৭) মাঝে মধ্যে কাজের বিরতি দিন: কাজের মাঝে মধ্যে কয়েক মিনিটের জন্য বিরতি দিন। এক ঘণ্টা কম্পিউটারে কাজ করে পাঁচ থেকে দশ মিনিটের বিরতি দিয়ে অন্য কোনো দিকে দেখুন বা অন্য কোনো কাজে সময় কাটিয়ে আবার কম্পিউটারের কাজ শুরু করতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২ ঘণ্টা একটা কম্পিউটারে কাজ করে ১০-২০ মিনিটের বিরতি দিলেও একই রকম ফল পাওয়া যায়।
৮) কাজের জায়গায় কিছু পরিবর্তন : কম্পিউটারে কাজ করার চেয়ারটি হাইড্রোলিক হলে ভালো হয়, যাতে কাজের সময় চোখের উচ্চতা কম্পিউটার মনিটরের চেয়ে সামান্য উঁচুতে থাকে। মনিটর চোখের বরারব থাকতে হবে। মনিটর বাকা থাকলে অক্ষরগুলোর পরিবর্তন (distortion) হতে পারে যা চোখের ব্যথার কারণ হতে পারে। অনেক সময় টাইপ করার কপিটি এখানে সেখানে রেখে বার বার মনিটর থেকে অনেকখানি দূরে কপি দেখতে হয়। এতেও মাথাব্যথা ও চোখব্যথা হতে পারে। মনিটরের পাশেই পরিমিতি আলো ফেলে কপি স্ট্যান্ডে এই লেখাগুলো রাখা যেতে পারে। তাতে বারবার চোখের একোমোডেশনের পরিবর্তন কম হবে ও কাজ আরামদায়ক হবে।
৯) কাজের ফাঁকে ফাঁকে ব্যায়াম : কম্পিউটারে কাজের সময় শুধু চোখের বা মাথার ব্যথা হয় না- অনেকেরই ঘাড়ে ব্যথা, কাঁধে ব্যথা, কোমরে ব্যথা- এসব উপসর্গ হতে পারে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে যদি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাত-পা ও কাঁধের নাড়াচাড়া করা হয় বা ব্যায়াম করা হয়, তাহলে ওপরের উপসর্গগুলো থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ আই হসপিটাল, ধানমন্ডি,






0 comments:
Post a Comment